মৃত ব্যক্তির গোসলের নিয়ম-পুরুষ নারী শিশুর কাফন-জানাযার নামাজের শর্ত-

মৃত ব্যক্তির গোসলের নিয়ম,পুরুষের নারীর শিশুদের কাফন, জানাযার নামাজের শর্ত-আসরাফ আলী থানভী (রাহ.)

মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেয়া জীবিতদের উপর ফরজে কেফায়া এবং পুরুষের গোসল পুরুষে আর মেয়েদের গোসল মেয়েরা দিবে এবং গোসল দেয়ার ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির কাছের আত্মীয়রাই উত্তম। যদি তাদের মধ্যে গোসল দেয়ার মত কেউ না থাকে তবে যে কোন একজন দ্বীনদার ব্যক্তি মৃত ব্যক্তির গোসল দিবে।


গোসল দেয়ার পদ্ধতি


প্রথমত মৃত ব্যক্তিকে একটি কাঠের খাটি বা অন্য কোন উঁচু বস্তুর উপর রাখবে। এরপর তার চতুর্দিকে কাপড় বা অন্য কিছু দ্বারা ঘিরে ফেলবে, যাতে করে ভিতরে কি হচ্ছে তা অন্য কেউ বুঝতে না পারে। যদি গোসলখানায় গোসল দেয়া হয় তবে অতিরিক্ত পর্দা দেয়ার প্রয়োজন নেই। আর ঐ পর্দার অন্তরালে গোসলদাতা ও সাহায্যকারী এ দু'জন ব্যতীত আর কেউ থাকবে না খাটের চারিদিকে আগর বাতি জালিয়ে দেয়া ভাল।


এরপর মৃত ব্যক্তির সকল কাপড়-চোপড় তার শরীর থেকে খুলে ফেলতে হবে। নাভী হতে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত অন্য একটি কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। অতঃপর হাতে কাপড় পেঁচিয়ে ঢিলা ও পানি দিয়ে মৃত্যের ইস্তেন্জা করিয়ে দিতে হবে। এ সময় ভুল ক্রমেও সতরের দিকে তাকানো যাবে না। বস্ত্রহীন হাতে লজ্জাস্থান স্পর্শও করা যাবে না।


এরপর মৃত ব্যক্তিকে অজু করিয়ে দিবে তবে নাকে ও মুখে পানি প্রবেশ করাবে না, ভিজা কাপড় দ্বারা মুখের ভিতর ও নাক মুছে পরিষ্কার করে দিবে, ওজু করানোর সময় প্রথমে মুখমণ্ডল এরপর ডান হাত ও পরে বাম হাতের কনুই পর্যন্ত ধৌত করতে হবে। অতঃপর মাথা মাছেহ্ করাতে হবে। এরপর আগে ডান পা ও পরে বাম পা ধোয়াতে হবে।


এরপর বড়ই পাতা দিয়ে গরম করা পানি নিয়ে গোসল করাতে হবে। বড়ই পাতা না থাকলে অন্য কোন ঔষধ বা শুধু গরম পানি দিয়েই গোসল করাবে। গোসলের পূর্বে নাকে ও কানে কিছু তুলা দিয়ে আটকে দিতে হবে যাতে করে পানি ঢুকতে না পারে। (যদি কার ঋতুবর্তী বা নিফাস বা ফরজ গোসল থাকাকালীন মৃত্যু হয় তবে তার নাকে ও মুখে পানি পৌঁছাতে হবে) এরপর মাথার চুল ও দাড়ি সাবান দ্বারা ভালভাবে ধৌত করাতে হবে। এরপর মৃত ব্যক্তিকে বাম কাতে শুইয়ে দিয়ে ডান পার্শ্বে তিনবার বা পাঁচবার পানি ঢেলে ভালভাবে ধৌত করতে হবে।


এরপর ডান কাতে শুইয়ে দিয়ে পূর্বের ন্যায় বাম পার্শ্বে পানি ঢেলে ভালভাবে ধৌত করতে হবে। এরপর মৃত ব্যক্তিকে নিজের সাথে বা অন্য কোন কিছুর সাথে সামান্য হেলান দিয়ে বসিয়ে আস্তে আস্তে পেটে চাপ দিবে, যাতে করে পেটের ভিতর কোন কিছু থাকলে তা যেন বের হয়ে যায়। যদি কিছু বের হয় তবে তা ধুয়ে ফেলবে। এতে করে নতুন অজু করানোর প্রয়োজন হবে না। এভাবেই গোসলের কাজ সমাধা হয়ে যাবে।


গোসলের পর শুকন কাপড়ের মাধ্যমে সমস্ত শরীর ভালভাবে মুছে ফেলতে হবে। এরপর মৃত ব্যক্তির মাথা, কপাল, দাড়ি, নাক উভয় হাতের মৃত ব্যক্তিকে বাম কাতে শুইয়ে দিয়ে ডান পার্শ্বে তিনবার বা পাঁচবার পানি ঢেলে ভালভাবে ধৌত করতে হবে। এরপর ডান কাতে শুইয়ে দিয়ে পূর্বের ন্যায় বাম পার্শ্বে পানি ঢেলে ভালভাবে ধৌত করতে হবে।


এরপর মৃত ব্যক্তিকে নিজের সাথে বা অন্য কোন কিছুর সাথে সামান্য হেলান দিয়ে বসিয়ে আস্তে আস্তে পেটে চাপ দিবে, যাতে করে পেটের ভিতর কোন কিছু থাকলে তা যেন বের হয়ে যায়। যদি কিছু বের হয় তবে তা ধুয়ে ফেলবে। এতে করে নতুন অজু করানোর প্রয়োজন হবে না। এভাবেই গোসলের কাজ সমাধা হয়ে যাবে।


গোসলের পর শুকন কাপড়ের মাধ্যমে সমস্ত শরীর ভালভাবে মুছে ফেলতে হবে। এরপর মৃত ব্যক্তির মাথা, কপাল, দাড়ি, নাক উভয় হাতের তালু, উভয় হাঁটু ও পায়ের তালুতে আতর বা কর্পূর লাগিয়ে দিতে হবে।


একটি জ্ঞাতব্য


যদি কোন অঙ্গ যথা হাত, পা, মাথা, ইত্যাদি পাওয়া যায় তবে গোসল ছাড়াই তা দাফন করে দিবে। তদ্রুপ যদি মাথা বিহীন শরীরের অর্ধেক বা তার চেয়ে কম পাওয়া যায় তবে তাও বিনা গোসলে দাফন করতে হবে। আর যদি মাথাসহ অর্ধেক বা মাথা ছাড়া অর্ধেকের কম পাওয়া যায় তবে তাকে গোসল ও কাফন দাফন করতে হবে এবং তার জানাজার নামাযও পড়া হবে।


যদি কোন মৃত্যের পরিচয় পাওয়া না যায় যে, সে মুসলমান না কাফের এবং তার শরীরে যদি এর কোন চিহ্নও না পাওয়া যায় তখন তাকে যদি দারুল ইসলাম বা ইসলামী এলাকায় পাওয়া যায় তবে তাকে গোসল ও কাফন দাফন করে তার জানাজার নামাযও আদায় করতে হবে। আর যদি তাকে দারুল কুফুর বা কাফেরদের এলাকায় পাওয়া যায় এবং সে মুসলমান না কাফের তা যদি সনাক্ত করা না যায় তবে তাকে গোসল ও কাফন দাফন করতে হবে না এবং তার জানাজার নামাযও পড়া হবে না।


কাফন


মৃত্যুর পর যে কাপড় পরায়ে মানুষকে কবরস্থ করা হয় তাকেই কাফন বলা হয়। পুরুষের কাফনে সাত হতে সাড়ে সাত গজ কাপড়ের প্রয়োজন হয়। আর মহিলাদের দশ হতে সাড়ে দশ গজ কাপড়ের জরুরত হয়।



পুরুষের কাফন


পুরুষের কাফনের ৩টি কাপড়ের প্রয়োজন হয় 

(১) চাদর, এর দৈর্ঘ্য হবে সাড়ে চার হাত। এর দ্বারা পা হতে মাথা পর্যন্ত ঢেকে দেয়া হবে। 


(২) ইযার, এর মাথা হতে পা পর্যন্ত হবে। এর দৈর্ঘ্য সাড়ে তিন হাত হবে। 


(৩) জামা বা কোর্তা ইহা সেলাই বিহীন হওয়া আবশ্যক। এতে আস্তিন বা কল্লি কিছুই থাকবে না। শুধু মাঝখানে মাথা ঢুকানোর জন্য একটু ছিড়া থাকবে। কোর্তা দ্বারা গলা হতে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত ঢাকতে হবে। এর দৈর্ঘ্য হবে হয় হাত।




মেয়েদের কাফন


মেয়েদের কাফনের জন্য পাঁচটি কাপড় হওয়া জরুরী। 


১। চাদর। এর দৈর্ঘ্য হবে সাড়ে চার হাত 


(২) এর, ইহার দৈর্ঘ্য হবে সাড়ে তিন হাত।

 

(৩) কোর্তা, এর দৈর্ঘ্য হবে ছয় হাত। মাঝখান দিয়ে মাথা প্রবেশ করানোর জন্য ফাড়া থাকতে হবে।

 

(৪) মাথা বন্দ বা উড়না। এটা দৈর্ঘ্যে তিন হাত হবে এবং প্রস্থে দেড় হাত বা তার চেয়ে সামান্য বেশি। এরদ্বারা মহিলাদের মাথা ও চুল বেঁধে চুলগুলো বুকের উপর দিয়ে দিতে হবে। 


(৫) সিনাবন্দ এটা বগল হতে উরু পর্যন্ত লম্বা হতে হবে এবং প্রস্থে চাদরের মতই হবে। এটা দিয়ে বুক ও স্তন বাঁধতে হবে।


বিঃ দ্রঃ যদি কোন কারণ বশতঃ পুরুষের জন্য তিনটি কাপড় ও মেয়েদের জন্য পাঁচটি কাপড় পাওয়া না যায় তবে যতটুকু পাওয়া যাবে তার দ্বারাই কাফন দিলেই যথেষ্ট হবে।


শিশুর কাফন


যদি কোন বাচ্চা জীবিত জন্ম নিয়ে পরে মারা যায়, তবে তার নাম রাখতে হবে, তাকে কাফন দাফন করতে হবে ও তার জন্য জানাযার নামায পড়তে হবে।


আর যদি শিশু মৃত জন্ম হয় তবে তাকে কাপড় পেঁচিয়ে দাফন করবে তার জানাযা পড়া হবে না, নিয়মানুযায়ী তাকে তিনটি কাপড়ও পড়ান হবে না। তদ্রুপ যদি কার অকাল গর্ভপাত এবং কোন অংগ যথা, মাথা, হাত, পা ইত্যাদি প্রকাশ না পায় তবে তাকে নামকরণ করতে হবে না। নিয়মানুযায়ী কাফন ও জানাযা পড়া হবে না।



জানাজার নামায


মৃতের প্রতি জীবিতদের শেষ দায়িত্ব হল তার নামাজে জানাজা পড়ে তাকে করবস্থ করা। মৃতের জন্য নামাজে জানাযা ফরজে কেফায়াহ্ । যদি কোন একজন তা আদায় করে দেয় তবে সকলের পক্ষ হতে এটা কোন একজন তা আদায় করে দেয় তবে সকলের পক্ষ হতে তা আদায় হয়ে যাবে, আর যদি কেউ না পড়ে তবে সকলেই গোনাহগার হবে। জানাযার নামাযের অর্থ হল মৃতের জন্য দোয়া করা। ভাই সকলেই উচিত জানাযায় শরীক হওয়া।


জানাযার নামায়ের শর্ত


জানাযার নামাযের জন্য শর্ত হল- 

(১) জায়গা পাক হওয়া 

(২) কাপড় পাক হওয়া 

(৩) সতর ঢাকা 

(৪) কেবলামুখি হওয়া 

(৫) মৃত ব্যক্তি পুরুষ না মহিলা তা জেনে নিয়ত করা, (৬) ইমাম প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া 

(৭) মাইয়েত মুসলমান হওয়া 

(৮) শবদেহ পবিত্র হওয়া 

(৯) কাফন পবিত্র হওযা 

(১০) মৃতের খাট মাটির উপর থাকা,

 (১১) মৃতের সতর ঢাকা থাকা।


জানাযার ফরজ ওয়াজিব ও সুন্নতের বর্ণনা এর ফরজ মাত্র দুটি- (১) দাঁড়িয়ে জামাজ আদায় করা (২) চার তাকবীর বলা।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url