শবে কদরের ফজিলত

 



শবে কদর --লাইলাতুল কদর





শবে কদরের ফজিলত

১. কুরআন মজীদ এ রাতে প্রথম নাযিল হয়।
২. এ রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়ে উত্তম।

৩. এ রাতে সিদরাতুল মোনতাহায় অবস্থিত অগণিত ফিরেশতাসহ হযরত জিব্রাঈল আলাইহিস্ সালাম দুনিয়ায় অবতীর্ণ হন এবং দুনিয়ার সমস্ত অংশে ছড়িয়ে পড়েন। প্রত্যেক স্থানে স্থানে সিজদা, রুকু করেন। মুমিন নর-নারীর জন্য দোয়ায় মজলিসে জড়ো হন। কিন্তু গির্জা ও মন্দির প্রতিমা, অগ্নি পূজার স্থানে, আবর্জনার স্তুপে ইত্যাদি এবং যে ঘরে নেশাখোর, বাদ্যযন্ত্র প্রভৃতি থাকে সে ঘর হতে তারা দূরে সরে থাকেন। [তাফসীরে ইবনে কাসির]
৪. এ রাতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের তাজাল্লী বিকশিত হয়।
৫. এ মহান রজনীতে আল্লাহ তা'আলা অসংখ্য গুনাহগারকে মাফ করেন।
৬. এ রাতের তওবা কবুল হয়।
৭. এ রাতের ইবাদতে মশগুল প্রত্যেক মুমিনকে ফেরেশতারা সালাম করেন। হযরত জিব্রাঈল আলাইহিস্ সালাম তাদের সাথে মোসাফাহা করেন। শরীরের লোম খাড়া হয়ে যাওয়া, দিল নরম হওয়া, অশ্ৰু বহির্গত হওয়া ইত্যাদি তার মুসাফাহার আলামত।

৮. এ রাতে মাতা পিতা ও আত্মীয় স্বজনের রুহের মাগফিরাতের উদ্দেশ্যে তাদের কবর জিয়ারত ও তাদের জন্য দোয়া করলে আল্লাহ কবুল করেন।
৯. এ রাতে হযরত জিব্রাঈল আলাইহিস্ সালাম স্বীয় পাখাগুলো পাখা মেলে ধরেন।

১০. এ রাতে একজন মুমিন কি দোয়া পড়বে এ প্রসঙ্গে হযরত আয়শা রাদ্বিয়াল্লাহুতা'আলা আনহা বলেনঃ

قلت يا رسول الله صلى الله تعالى عليه وسلم إن وافقت ليلة القدر فما أقول؟ قال قولي اللهم إنك عوق تحب العفو فاعف عنى

কুরআন-সুন্নাহ'র আলোকে পবিত্র শবে বারাআত, শবে কদর ও রমযানুল মুবারক আমি বললাম, আল্লাহর রাসুল যদি শবে কদর পেতে সক্ষম হই কি পড়ব? রাসুল (স) বললেন তুমি এটি পড়বেঃ-

اللهم إنك عفو تحب العفو فاعف عني

আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউবুন তুহিব্বুল আফউয়া ফা-ফু আন্নী হে আল্লাহ আপনিতো ক্ষমাপছন্দ করেন আমাকেও ক্ষমা করুন।
[তিরমিযী, মসনদে আহমদ]

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু বলেন, এ রাতে পড়ার জন্য আল্লাহর রাসুল যে দোয়া শিখাইয়েছেন তা হলঃ-
اللهم ارزقني فيـه فـضـل ليلة القدر وصير أموري فيه من العشر إلى اليسرواقبل معاذيرى وحط عنى الذنب والوزر
ياروفا بعباده الصالحين
আল্লাহ আজকের রাতে আমাকে শবে কদরের ফজিলত দান করো। আমার কাজ কর্মকে কঠিন থেকে সহজতর দিয়ে নিয়ে নাও। আমার অক্ষমতা কবুল করো। আমার পাপ সমূহ মার্জনা করো। হে যোগ্য বান্দাদের প্রতি মেহেরবান খোদা!

[৩০ রমযানের ৩০ দোয়া, পৃ. ৮৭] শবে কদর কোন রাতে এ নিয়ে বিভিন্ন মত প্রকাশ করা হয়েছে। হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু এর যুগে সর্বসম্মতিক্রমে স্বীকৃত হয়েছে যে, ইহা রমযানের শেষের দশ দিনে রয়েছে। কোন হাদীসে ১৭, আবার কোন হাদীসে ২৩, কোন হাদীসে ২৪ এবং বেশীর ভাগ আলেমের মতে ২৭ তারিখ শবে কদর।

হযরত আয়শা রাদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহা বর্ণনা করেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহতা'আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন

تحروا ليلة القدر في الوتر العشر الأواخر من رمضان "রমযানের শেষ দশকে বেজোড় রাতে শবে কদর অন্বেষণ করো।

[বুখারী ১ম খন্ড, পৃ. ২৭০ বিভিন্ন মতের সামঞ্জস্য বিধান করে হযরত ইমাম শাফেয়ী রাদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু বলেন আসলে এসব বর্ণনা বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর যেমন কেহ জিজ্ঞেস করল হুজুর আমরা শবে কদর অমুক রাতে তালাশ করব কি? উত্তরে হুজুর বললেন, হ্যা তালাশ কর। প্রকৃতপক্ষে শবে কদর নির্ধারিত এতে কোন পরিবর্তন হয় না। আবু কুলাবা বলেন শেষ দশকের রাতগুলোতে এটা ঘুরাফেরা করে পরিবর্তিত হয়।

ইমাম মালিক রাহমাতুল্লাহি তা'আলা আলায়হি, ইমাম সুফিয়ান সওরী রাহমাতুল্লাহি তা'আলা আলায়হি, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রাহমাতুল্লাহি তা'আলা আলায়হি, ইমাম ইসহাক ইবনে রাহওয়াই রাহমাতুল্লাহি আলাইহি, আবু বকর ইবনে খুযাইমা রাহমাতুল্লাহি তা'আলা আলায়হি’র মতে এটাই সঠিক। [তাফসীরে ইবনে কাসীর, বরকতের রাত-৪৪] ইমাম মালেক রাহমাতুল্লাহি তা'আলা আলায়হি রমযানের শেষ দশ রাতে

সমানভাবে শবে কদর অনুসন্ধান করা উচিৎ, হযরত শাহ্ওলীউল্লাহ মুহাদ্দিস

দেহলভী রাহমাতুল্লাজিহ তা'আলা আলায়হি বলেন শবে কদর ২টি।

১. একটিতে বিশ্ব প্রশাসনের বিধি-ব্যবস্থা নির্ধারিত হয়। এ শবে কদর অনির্দিষ্টএক এক বৎসর এক এক রাতে অনুষ্ঠিত হয়।
২. দ্বিতীয়টি হলো কল্যাণ, ফয়েজ ও বরকত সাওয়াব বৃদ্ধি এবং ফেরেশতাদের অবতরণ ইত্যাদির জন্য এ রাত রমযানের শেষ দিকের বেজোড় রাতগুলোর মধ্যে রয়েছে। ঘটনাক্রমে কুরআন নাযিলের সময় উভয় রাত মাহে রমযানে একত্রিত হয়। [২০০হুজ্জাতুল্লাহি বালিগ]

শবে কদরের রাতে রহমত থেকে যারা বঞ্চিতঃ-

এ পবিত্র ও মহিমান্বিত রাতে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত থেকে যারা বঞ্চিত থাকবে তারা হল।

১। মদখোর, মাদকদ্রব্য ব্যবসায়ী।

২। মাতাপিতার অবাধ্য সন্তান।

৩। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী।

৪ । ইচ্ছাকৃত শক্তি থাকা সত্ত্বেও নামায তরককারী।

৫। বিনা কারণে অপর মুসলমান ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্নকারী।

[তাফসীরে কাশফুল আসরার ১ম খন্ড, পৃ. ৫৬৪] উপরোক্ত দোষে যারা দোষী তারা এ রাতের বরকত পাওয়ার জন্য প্রথমেই খালেছ অন্তরে তওবা করতে হবে। তাদের তওবা আল্লাহ কবুল করার পরই তারা এই রাতের ফজিলত লাভ করবে। এ রাতে যারা নিজের অপরাধ ক্ষমা চেয়ে এবং আল্লাহর রহমত কামনা করে চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে কাঁদবে এবং যার চোখ দিয়ে পানি বের হবে বুঝতে হবে হযরত জিব্রাঈল তার হাতের উপর হাত দিয়েছে। [কাশফুল আসরার-১ম খন্ড, পৃ. ৫৬৫] এ রাতের নামায ও ইবাদতের উসিলায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অতীতের গুনাহ্ক্ষমা করেন। যেমন বর্ণিত হয়েছে

النبي صلى الله تعالى عليه وسلم من عن أبي هريرة رضي الله تعالى عنه عنى ا

قام ليلة القدر إيمانا واحتسابا غفر له ما تقدم من ذنبه হযরত আবু হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু বর্ণনা করেন, আল্লাহর নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে লোক ঈমানের সাথে সাওয়াবের নিয়তে কদর রাতে আল্লাহর ইবাদতের জন্যে দরবারে এলাহীতে দন্ডায়মান হবে তার বিগত জীবনের সমস্ত গুনাহ্ মাফ করে দেয়া হবে। [বুখারী শরীফ ১খণ্ড, পৃ. ২৭০]

এ হাদীসে দণ্ডায়মান হওয়ার যে কথা রয়েছে তা শুধু নামাযের অবস্থায় দণ্ডময়মান হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং এ রাতে নামায, তিলাওয়াতে কুরআন যিকির, ইস্তিগফার, তসবীহ্ পাঠ, বেশী বেশী দরুদ শরীফ পড়া একান্ত করনীয়। আল্লামা আলুসী রাহমাতুল্লাহি তা'আলা আলায়হি লিখেছেনঃ লাইলাতুর কদরে সর্ব প্রকার এবাদতই হওয়া উচিৎ। যেমন নফল নামায, তেলাওয়াতে কুরআন কারীম। আল্লাহর জিকির তাসবীহ্ পাঠ। ক্ষমা প্রার্থনা এবং দোয়া এসব থাকা উচিতৎ (ফাযায়েলে রমযান, মুফতী আমীনুল এহসান রাহমাতুল্লাহি তা'আলা আলায়হি, পৃ. ২৭]

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url