আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার দোয়া
![]() |
মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা অনেক বড় নেকীর কাজ এবং এর ফযীলত ও মর্যাদা অফুরন্ত। নবী করীম (সা)-এর জীবনে কোনো গোনাহ্ ছিলো না, তিনি ছিলেন নিষ্পাপ মাসুম। তবুও তিনি প্রত্যেক দিন আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন এবং বলতেন, আমি প্রতি দিন ৭০ বারেরও অধিক ক্ষমা প্রার্থনা করি। কারণ বান্দা যখন আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, তখন আল্লাহ অত্যন্ত খুশী হন এবং সেই বান্দার দিকে রহমতের দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন।
ভুল হলে ভুলের স্বীকৃতি দেয়া বা ক্ষমা চাওয়া নবী-রাসূলদের নীতি। প্রথম নবী ও রাসুল হযরত আদম (আ) যখন উপলব্ধি করতে পারলেন যে তিনি ভুল করেছেন তখন একটি মুহূর্তও আর দেরী করেননি, সাথে সাথে নিজের ভুলের স্বীকৃতি দিয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে সিজদাবনত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। আর ভুলের স্বীকৃতি না দেয়া, স্বীকৃতি দিতে লজ্জানুভব করা, নিজে ছোট হয়ে যাঝে বলে ধারণা করা, ভুল করে সেই ভুলের ওপর অটল থাকা হলো ইবলিস শয়তানের নীতি, অভিশপ্ত এই শয়তানই সব থেকে বড় ভুল করেছিলো। অথচ সে ভুলের স্বীকৃতি না দিয়ে দাম্ভিকতা প্রকাশ করলো, যার ফলে চির অভিশপ্ত হয়ে গেলো এবং জাহান্নামেই হবে তার শেষ আশ্রয়স্থল। সুতরাং ভুল হলে অবশ্যই ভুলের স্বীকৃতি দিতে হবে এবং সাথে সাথে মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা বা ইস্তেগফার করা শুধুমাত্র গোনাহ্ মাফের কাফফারাই নয়, বরং দুনিয়ার জীবনে বিপদ আপদ, মুসিবত, হয়রানী পেরেশানী থেকে মুক্ত থাকারও কারণ।
যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর কাছে যত বেশী ক্ষমা প্রার্থনা বা ইস্তেগফার করে, সেই ব্যক্তি দুনিয়ার জীবনে ততবেশী প্রশান্তির সাথে দিন অতিবাহিত করে। মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করার যত দু'আ নবী কারীম (সা) শিখিয়েছেন, তার মধ্যে একটি দু'আকে সাইয়েদুল ইস্তেগফার বা সব থেকে বড় ক্ষমা প্রার্থনা
বলা হয়েছে।
নবী করীম (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি এই দু'আটি দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে দিনে পড়বে,
সন্ধ্যার পূর্বে যদি সেই ব্যক্তি ইন্তেকাল করে তাহলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে সন্ধ্যা বা রাতে পড়বে, সকাল হবার পূর্বে যদি সেই ব্যক্তি ইন্তেকাল করে তাহলে সে বেক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবেন। সে দু'আটি হলো : اللهم أنت ربي لا إله إلا أنت خلقتني وأنا عبدك وأنا على عهدك ووعدك ما استطعت أعوذبك من شر ما صنعت . أبوء لك بنعمتك على وأبوء بذنبي فاغفر لي فإنه لا يغفر
الذنوب إلا أنت .
(আল্লাহুম্মা আনিতা রাব্বী লা ইলাহা ইল্লা আদিতা খালাকুতানি ওয়া আমা আবদুকা, ওয়া আনা আলা আদিকা ওয়া ওয়াদিকা মাস্তাাতু আউয়ুবিকা মিন সাররি মা সামাভু আবুউলাকা বিনিমাতিকা আলাইয়্যা ওয়া আবুষ্ট বিষামূম্বী কাপরিমানী ফাইব্রাহ লা ইয়াফিরুথ যোনুবা ইল্লা আমৃতা।)
হে আল্লাহ। তুমিই আমার রব, তুমি ব্যতীত দাসত্ব লাভের যোগ্য কোনো ইলাহ নেই। তুমিই আমাকে সৃষ্টি করেছো, আমি তোমার বান্দাহ্। যতক্ষণ আমার সামর্থ্য রয়েছে, ততক্ষণ আমি তোমার আনুগত্য ও অঙ্গীকারের ওপর অবিচল রয়েছি। আমি আমার অন্ত পরিণতি থেকে তোমার কাছে পানাহ্ চাচ্ছি। আমি তোমার সকল নিয়ামতের প্রতি সাক্ষ্য দিচ্ছি এবং প্রশংসা করছি, যা তুমি আমাকে দান করেছো। আমি আমার সকল গোনাহের জন্যে লজ্জিত, তুমি অনুগ্রহ করে আমাকে ক্ষমা করে দাও। কারণ তুমি ব্যতীত কেউ-ই গোনাহ্ ক্ষমা করতে পারে না না। (বুখারী, হাদীস ৬৩০৬, ৬৩২৩)
ভাওবাকারীর জন্য ফেরেশতাদের দু'আ তাওবা শব্দের অর্থ প্রত্যাবর্তন করা। গোনাহগার বান্দা তাওবার মাধ্যমে আল্লাহর নাফরমানী থেকে আল্লাহর দিকে পুনরায় ফিরে আসে। বান্দা যত গোনাই করুক না কেন আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে তিনি ক্ষমা করেন। বান্দার গোনাহ্ এত বড় তাঁর রহমত এর চাইতেও বড়। তাই নিরাশ হওয়ার কোন কারণ নেই। আল্লাহপবিত্র কুরআন মাজীদে এরশাদ করেছেনঃ قل يعبادي الذين أسرفوا على أنفسهم لا تقنطوا من رحمة الله -
إن الله يغفر الذنوب جميعا ط إنه هو الغفور الرحيم -
অর্থ : (হে নবী) তুমি (তাদের) বলো, হে আমার বান্দারা, তোমরা যারা নিজেদের প্রতি যুলম করেছো, তারা আল্লাহ তা'আলার রহমত থেকে (কখনো) নিরাশ হয়ো না। অবশ্যই আল্লাহ তা'আলা (মানুষের) সমুদয় পাপ ক্ষমা করে দেবেন, তিনি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। (সূরা আয যুমার ৫৩)
এ আয়াত অনুযায়ী আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া নিষিদ্ধ বা কুফরী। রাসূল (সা) বলেছেনঃ
إن الله يبسط يده بالليل ليتوب مسي النهار ويبسط يده بالنهار
الشمس من مغربها . ليتوب مسئ الليل حتى تطلع ا
অর্থ : আল্লাহ তা'আলা দিনে গোনাহকারীদের গোনাহ্ ক্ষমা করার জন্য রাতে নিজ ক্ষমার হাত সম্প্রসারিত করেন এবং রাতে গোনাচুকারীদের গোনাহ মাফ করার জন্যে তিনি ক্ষমার হাত সম্প্রসারিত করেন। কিয়ামতের আগে পশ্চিমে সূর্যোদয় পর্যন্ত এভাবেই চলতে থাকবে। হাদীসে কুদসীতে বর্ণিত : মহান আল্লাহ বলেন, হে আমার বান্নাৱা। তোমরা দিনে রাতে গোনাহ করে থাকো, আর আমি সফল গোনাহ মাফ করি। তোমরা আমার কাছে ক্ষমা চাও, আমি তোমাদের গোনাহ মাফ করে দেব। (মুসলিম) গোনাহ্ মাফের জন্যে এই চাইতে বড় প্রতি আয় হতে পারে? আল্লাহ আরও বলেন :
وهو الذي يقبل التوبة عن عباده ويعفو عن السبات ويعلم ما
অর্থ : তিনি সেই সত্তা যিনি সাহারার গোনাহ মাফ করেন এবং তোমরা যা করো সঙ্গ কিছু তিনি । (সূরা সূরা ২৫)
তিনি বান্দার তাওবা কবুল করেন। কিন্তু শর্ত হলো এখলাসের সাথে তাওবা করতে হবে এবং এরপর ইচ্ছাকৃতভাবে আর সেই গোনার পুনরাবৃত্তি করা যাবে না। আল্লাহ বলেন : অশ্লীল কাজ করে ফেললো কিংবা নিজেদের আত্মার উপর যুগ্ম করে ফেললো, নিজেদের গোনার জন্য আল্লাহকে স্মরণ করলো; আল্লাহ ছাড়া আর কে আছে যিনি গোনাহ মাফ করেন এবং তারা জেনে শুনে কৃত গোনাহর পুনরাবৃত্তি করে না। তাদের পুরস্কার হলো; আল্লাহর ক্ষমা এবং এমন জান্নাত যার ভলদেশ দিয়ে নহর প্রবাহিত তারা সেখানে চিরদিন থাকবে। আমলকারীদের পুরস্কার কতই না উত্তম। (ইমরান ১৩৫, ১৩৬) রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ
والله إني لأستغفر الله واتوب اليه في اليوم أكثر من سبعين অর্থ : আল্লাহর কসম, আমি দিনে আল্লাহর কাছে ৭০ বারের অধিক তাওবা -এস্তেগফার করি। (বুখারী) হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, মৃত্যুর আগে
নবী কারীম (সা) নিম্নের বাক্যটি অধিকহারে উচ্চারণ করতেন :
سبحان الله وبحمده أستغفر الله وأتوب إليه -
অর্থ : আল্লাহর পবিত্রতা ও প্রশংসা বর্ণনা করছি এবং আল্লাহ তা'আলার কাছে গোনাহ্ মাফ চাচ্ছি ও তাওবা করছি। (বুখারী ও মুসলিম) সুতরাং নিষ্পাপ নবী দিনে ৭০ বারের বেশী তাওবা করলে পাপী উম্মাহর সদস্যদের আরো বেশী তাওবা করা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন :
من أحب أن تسره صحيفته فليكثر فيها من الاستغفار -
অর্থ : যে ব্যক্তি নিজ আমলনামা দেখে খুশী হতে চায় সে যেন বেশী করে গোনাহ্ মাফ চায়। (বায়হাকী শুআবুল ঈমান, আলবান্নী একে বিশুদ্ধ হাদীস বলেছেন) নবী করীম (সা) আরো বলেনঃ
طوبى لمن وجد في صحيفته استغفار كثير .
অর্থ : যার আমলনামায় অধিক পরিমাণে এস্তেগফার থাকবে তার জন্য সুখবর। (ইবনে মাজাহ্, নাসেরুদ্দিন আলবানী হাদীসের সনদকে বিশুদ্ধ বলেছেন)। রাসূলুল্লাহ (সা) আরো বলেছেন :
أستغفر الله الذي لا إله إلا هو الحي القيوم وأتوب إليه غفرت ذنوبه وإن كان قد فر من الزحف -
অর্থ : যে ব্যক্তি বলে যে, আমি আল্লাহ তা'আলার কাছে গোনাহ্ মাফ চাই, তিনি ছাড়া আর কোন সত্যিকার মা'বুদ নেই। তিনি চিরঞ্জীব ও ধারক এবং আমি তার দিকেই প্রত্যাবর্তন করবো। তাহলে, তার গোনাসমূহ মাফ করে দেয়া হবে যদিও সে জিহাদের ময়দান থেকে পালিয়ে আসুক না কেন। (আবু দাউদ) জিহাদের ময়দান থেকে পালিয়ে আসা কবীরা গোনাহ। তা সত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলা তাকে মাফ করে দেবেন।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন : বান্দা যখন তাওবা করে তখন আল্লাহ তার উপর ভীষণ খুশী হন। (মুসলিম) রাসূলুল্লাহ (সা) আরো বলেছেন -
إن الشيطان قال وعزتك يا رب لا أبرح أغـوى عـبـادك مـادامت أرواحهم في أجسادهم فقال الرب وعزتي وجلالي لا أزال أغفر لهم ما استغفروني -
অর্থ : নিশ্চয়ই শয়তান বলেছে, হে আমার রব, আপনার ইজ্জতের শপথ করে
বলছি, আমি আপনার বান্দাদেরকে তাদের শরীরে প্রাণ থাকা পর্যন্ত গোমরাহ
করতে থাকবো। তখন রব বলেন ঃ আমার ইজ্জত ও শ্রেষ্ঠত্বের শপথ করে বলেছি, তারা যে পর্যন্ত ক্ষমা চাইতে থাকবে, আমি তাদেরকে মাফ করতে থাকবো। (আহমাদ) সুপ্রিয় পাঠকগণ! ক্ষমার জন্য এর চাইতে বড় আহবান আর কি হতে পারে? তাওবা এস্তেগফারকারীদের জন্য স্বয়ং আল্লাহর আরশ বহনকারী ফেরেশতা ও এর
চারপাশের ফেরেশতারা এই বলে দু'আ করে যে,
وقهم عذاب الجحيم ربنا وأدخلهم جنت عدن و التي وعدتهم ومنصلح من أبائهم وأزواجهم وذريتهم . إنك أنت العزيز الحكيم -
অর্থ : যারা তাওবা করে এবং তোমার (দ্বীনের) পথ অনুসরণ করে, তুমি তাদের জাহান্নামের আযাব থেকে বাঁচাও! হে আমাদের রব, তুমি তাদের সেই স্থায়ী জান্নাতে প্রবেশ করাও যার প্রতিশ্রুতি তুমি তাদের দিয়েছো, তাদের পিতামাতা, স্বামী-স্ত্রী ও তাদের সন্তান-সন্ততির মধ্যে যারা নেক কাজ করেছে (তাদেরও জান্নাতে প্রবেশ করাও) নিশ্চয়ই তুমি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (সূরা মুমিন ৭, ৮) তওবা এস্তেগফারের মর্যাদা আল্লাহর আরশ বহনকারী ফেরেশতাসহ অন্যান্য ফেরেশতাদের কাছেও অনেক বেশী। ফেরেশতারা নিষ্পাপ, তাদের দু'আ কবুল হয়। তাওবা করলে ফেরেশতারা তাওবাকারীর পরিবার ও সন্তানদেরকে বেহেশতে প্রবেশের জন্য আল্লাহর কাছে দু'আ করেন এটা মুসলমানদের জন্য কত বড় সৌভাগ্য।
আরো পড়ুন -
জুমার দিনের ফজিলত আমল ও আদব-আসরাফ আলী থানভী (রাহ.)
নষ্টারডেমাস এর ভবিষ্যদ্বাণী ? নাকি আবু হুরায়রা রা. এর পাণ্ডুলিপি !
মৃত ব্যক্তির গোসলের নিয়ম-পুরুষ নারী শিশুর কাফন-জানাযার নামাজের শর্ত-
