দিলদিওয়ানা প্রেমিকদের জন্য বাছাই করা ১০টি প্রেমের কবিতা
প্রেমের কবিতা
কিছু পাওয়া কিছু না পাওয়া কিছু ভগ্নস্বপ্ন নিয়ে বেচে থাকা বিশ্বের শেষ্ঠ কিছু কবিদের প্রেমের কবিতা। যা আপনার মনকে নিয়ে যাবে অলীক স্বপ্নময় ভালোবাসার জগতে, প্রেমময় কবিদের প্রেমের কবিতা।
কবি হাসান হাফিজুর রহমান এর বিখ্যাত প্রেমের কবিতা "তখন ডাকতে পারো"
তখন ডাকতে পারো
হাসান হাফিজুর রহমান
প্রেমের কতটা বোঝ তুমি,
সেকি পাওয়া, কিছু চাওয়া, হাতে হাত ছোঁওয়া কিংবা
মনের আড়ালে খেলাচ্ছলে যৌনতার উথাল পাতাল ?
তাকে প্রেম বলা ভুলে যাও তুমি।
যখন যখন
রক্তের আগুন সমস্ত সময় জুড়ে পোড়ায় শরীর,
লুপ্ত হয় আলো ও আঁধার, ডুবে যায়
আবিশ্ব ভুবন কেবলি বিনিদ্র জাগে
পাহাড়ী নদীর মত অন্ধ গতি এক গর্জমান ভালোবাসা,
এমন কি স্বপ্নটুকু যায় মুছে,
তখন ডাকতে পারো ডাক নাম ধরে তাকে, প্ৰেম ৷৷
কবি সৈয়দ আলী আহসানএর বিখ্যাত প্রেমের কবিতা "যেখানেই তুমি"
যেখানেই তুমি
সৈয়দ আলী আহসান
যেখানেই তুমি সেখানে শ্রাবণ
অথবা প্লাবন আগ্রহের,
যেখানে একদা বিরহ-ব্যাকুল
অথবা আকুল সমারোহের
অনেক কথার দ্বিধায় অচল
অথবা সজল সব শেষের,
আনন্দে দীপ তোমার নয়ন
যেন স্মরণ উৎসবের।
যেখানে তোমার চোখের সাগর
স্বপ্ন-বাসর সকল কাল,
সেখানে আমার প্রহর হারায়
দু'হাত বাড়ায় অনাদি কাল
যেখানে রাজ্য শুভ সংবাদ
অবিসংবাদ কামনালীন,
সেখানে ঘটনা পলাশের ফুলে
অথবা মুকুলে সব বিলীন।
যেন প্রহেলিকা দীপ্ত গান,
সেখানে কথারা কৌতুক সহ
আনে দুঃসহ অনভিমান
যেখানে শব্দ ওষ্ঠের তাপে
বিগলিত কাঁপে মদিরা যেন,
সেখানে বাতাসে সচকিত কাল
আকাশ পাতাল তরল যেন।
যেখানে তোমার ভুজবন্ধন
যেন অঙ্গন মহাদেশের,
সেখানে সকলে সীমানা হারায়
আকাশ নীলায় মহাকালের
মধ্যযুগের লতার মতন
গম্যভুবন অনির্দেশ,
এখানে হয়তো আমলকী শাখা
অথবা প্রশাখা ভগ্ন শেষ।
বুকের প্রসান লীলার কমল
লঘু চঞ্চল কম্পমান,
আলো মসৃণ একটি লেখার
যেনবা রেখার সব প্রমাণ
হৃদয়-আকাশে দুইটি নয়ন
তিলকাঞ্জন উজ্জীবন,
করাঙ্গুলীর রেখা-বিন্যাসে
তরঙ্গাকাশে সঞ্চরণ।
ক্ষীণ কটি দেশ একমুঠো
যেনবা অতুল অলৌকিক,
দুটি কুবলয় মৃণাল শোভায়
আশায় আশায় সকল দিক :
গুরুভার নিয়ে কটির পরিধি
নিয়ম বা বিধি অতিক্রম,
পলাতক রাতে প্রবল শাসন
যেনবা আসন-ব্যতিক্রম।
পাচীন কাব্যে উরু-সংযোগ
যেনবা অমোঘ দ্বিদল ফুল,
অরণ্যে যেন একাকী মৃগের
পদচিহ্নের রূপ অতুল
সেখানে পুরুষ সূর্য সমান
রূপ অম্লান অসংশয়,
সেখানে রাজ্য মধুর প্লাবনে
সর্ব-স্মরণে অদেয় নয় ।
পরিত্যক্ত দুর্গে যেমন
হঠাৎ কখন সন্ধ্যা তারা,
লেবুর শাখায় পাখিরা হঠাৎ
যেন দৈবাৎ কাকলীহারা
যেনবা বাতাসে হাঁসের পালক
যেন দর্শক অনবধান,
ঘন নিকুঞ্জে অনভিব্যক্ত
যেন অনুক্ত সম্প্রদান।
নিগূঢ় শ্রোণির গুরুভারে যার
যেন উৎসার অশান্তির,
হংস গমনে দ্বৈত আলাপ
কামনা যেনবা দীপাবলীর
সমুদ্রতল প্রবাল বাসর
অথবা পাথর যেন উপল
অধোগতি ঢেউ সেখানে কুমারী
শ্রীময়ী সে নারী প্রাণোচ্ছল,
যেখানে রমণী শ্রাবণ-বন্যা
যেন অনন্যা আগ্রহের,
সেখানে হৃদয় বিগলিত গান
যেন অম্লান সঞ্চয়ের
যেন প্রদীপের সব সংলাপ
সূর্যের তাপ অসংশয়,
সেখানে রাজ্য মধুর প্লাবনে
সর্ব-স্মরণে অদেয় নয় ৷
কবি জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী এর বিখ্যাত প্রেমের কবিতা "উৎসর্গ"
উৎসর্গ
জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী
চোখের কোণে সুখের হাসি সেই টুকুরই জন্যে
ওগো কন্যে
আমি একটুখানি ছোট্ট পুকুর
শান্ত সকাল স্তব্ধ দুপুর।
শিউলি বকুল চাঁপা ফুলের সুগন্ধ
চেয়েছিলাম, যাতে তোমার আনন্দ।
বুকের মাঝে সুখের ছোয়া সেইটুকুরই জন্যে
ওগো কন্যে,
আমি রাঙা মোরগ কতো রকম
নোটন পায়রা বকম বকম।
দুগ্ধবতী গাইএর খোঁজে দুরন্ত
মনে মনেই অন্য যুগের সামস্ত।
চোখের কোণে সুখের হাসি সেই টুকুরই জন্যে
ওগো কন্যে,
আমি চিত্রকরের লেখন তুলে
সারা দুপুর হেলে দুলে।
কল্পনারই কুটির করি জীবন্ত
ইচ্ছে আমার ছোটে যে দিক দিগম্ভ।
বুকের মধ্যে সুখের ছোঁয়া সেই টুকুরই জন্যে
ওগো কন্যে,
আমি আপাতত শব্দ নদীর
গভীর জলে আমার অধীর।
ছিপ ফেলেছি, হয়তো কিছু আসন্ন,
এবং তুমি হতেও পারো প্রসন্ন।
কবি আবদুল গণি হাজারী এর বিখ্যাত প্রেমের কবিতা "সংগীতাকে"
সংগীতাকে
আবদুল গণি হাজারী
সদ্যজাগ্রত পৃথিবীর শরীরে
তোমার লীলায়িত আলাপ,
মেঘের স্পর্শ যেন
আকাশের নাভিমূলে ।
হে সংগীতা তুমি
আমার সমুদ্রে টান দাও
এবং আমার মনের মীনকে সম্ভা করো
রঙিন ঝিনুকে সজ্জিত বিছানায়
আমার হৃদয়কে আস্তীর্ণ করো
সহস্র সুরের সন্তানে ।
তোমার যন্ত্রের মীড়ে
আমার বিশ্বাসী পিতার একান্ত মোনাজাত
আমার উদ্বিগ্ন মায়ের বক্ষের উষ্ণতা
তোমার দ্রুত আঙুলে সঞ্চালিত
আমার প্রাত্যহিক স্বপ্নরেশ
ব্রাহ্মমুহূর্তের প্রশান্তির পর্দায়
ভৈরবী হয়ে দোলে।
কবি আতাউর রহমান এর বিখ্যাত প্রেমের কবিতা "উপশমহীন"
উপশমহীন
আতাউর রহমান
একি ব্যাধি দিলে প্রভু, বিষ ছাড়া নেই উপশম,
অনুপান চাই তাতে মধুকণা সৌরভ ফুলের
ক্রোধের প্রহার চাই— নিষ্পেষণ নগ্ন বেশরম
আরো চাই তার সাথে মন্ত্রবাণী কবি-মাতালের।
একি বাধি দিলে প্রভু হাড়ে মাংসে তৃষ্ণার আকুতি
ওষ্ঠ জিহ্বা ত্বক নখ—যত অঙ্গ ভেতর বাহির
সকলের খাদ্য চাই—প্রণয়ের পবিত্র আরতি মুক্ত নয় ক্ষুধা থেকে তাপে পোড়ে হৃদয়শরীর।
অশ্রান্ত ক্ষুধার তাড়া কেড়ে নেয় বিশ্রামের ছায়া
স্বপনের মায়া পুষ্প ছিঁড়ে ফেলে দ্বিধাদ্বন্দ্বহীন, বিষের প্রণয়ে তৃপ্ত আরাধনা বেলেল্লা বেহায়া— বাস্তুভিটে কেড়ে নিয়ে—সৃষ্টি করে আলেয়া রঙীন,
উপশমহীন ব্যাধি হানে বেত আঁধারে আলোকে শেষ নেই আবর্তের কর্দমাক্ত কুটিল ভূলোকে।
কবি হাবীবুর রহমান এর বিখ্যাত প্রেমের কবিতা "যদি দেখা হতো"
যদি দেখা হতো
হাবীবুর রহমান
আজকের এই দুটি কথা
এতো সহজে বলতে কি পারতাম
যদি দেখা হতো আরও
বছর পনেরো আগে কোনদিন !
সেদিন ফুলের পাপড়িতে
রঙ বদল হতো সকাল-সন্ধ্যেয়,
আকাশের তারায় তারায় উঠতো গুঞ্জরণ,
স্বচ্ছ রেশমী বেলার লোলুপতায়
ঝরতো আলোর শিকর থোকায় থোকায়,
লাল আর হলদে পরাগে
আর একটি কল্পলোকের স্বপ্ন
জাগতো নীরব কথার সংগীত-!
দক্ষিণের প্রলুব্ধ হাওয়ার তারে নীড়
টানতো স্বতঃস্ফূর্ত।
এই দুটি সহজ কথা— তাদের
কথার দেয়ালের স্থাপত্যের আড়ালে
আর একটি নতুন অর্থের সংযোজন করতো
রঙীন তুলির কোমলাভ কারুকার্যে।
দুটি বিমুগ্ধ চোখের
ডাক আসতো মায়াবী হরিণের
চিত্রিত পাটল তনুর আমন্ত্রণের মতো।
তারি শরে আহত কুরঙ্গিনীর
কোমল মন প্রদোষকালের মূর্ছিত।
আলোর মতো, একটি আকুলতায় বিহ্বল হতো— তুহিনের মতো শুভ্র,
দুটি কপোলে জাগতো বিলাসের মৌসুম
অর্ধনমিত পয়োধরের তামাটে উত্তুংগতায়
করুপ হয়ে উঠতো একটি মাত্র বিলাপ ।
আর শুধুই এক অতৃপ্ত জ্বালা নিয়ে
আক্ষেপে ফেটে পড়তো আমার
তরুণ শিকারী মনে মনে রোদ ঝিলমিল
প্রমোদ-ক্লান্ত হ্রদের কচি ঘাসের বনে !
আজ সে শুধুই কল্পনা, ব্যর্থতার
মানিময় ইতিহাসের টুকরো যেনো!
তাই ভাবি অবাক হয়ে,
এই দুটি কথা এতো সহজে কি বলতে পারতাম যদি দেখা হতো আরও বছর পনেরো আগে কোনদিন ।
কবি আবদুস সাত্তার এর বিখ্যাত প্রেমের কবিতা "সে"
সে
আবদুস সাত্তার
না, যে নয়। তার কন্ঠস্বর আমি ভালো করে চিনি। বাঁকানো ভ্রুভঙ্গি নিয়ে অকারণে ওপাশের ছাদে অযাচিত ঘোরাফেরা, এ বেলা ও বেলা নির্বিবাদে
বই পড়া, খোঁপা খুলে চুল বাঁধা, এ সব কাহিনী
রয়েছে অনেক এই জালায়। আমি কী যে ঋণী
রোদ ও হাওয়ার কাছে; সন্ধানী চোখের বিনিময়ে
তার দেখা, তার ঘ্রাণ নির্মল বাতাসে সবিস্ময়ে
হৃদয়ের বহু কাছে সে যে ছিল স্বপ্ন-বিলাসিনী ।
সে আসেনি। কোনোদিন আসবে না। মুহূর্তের ভুলে তাকে তো করেছি পর, বিদায় বেলায় বেদনাকে
অশ্রুতে লুকালো শুধু চোখের কোণায়। আমি তাকেকোথায় খুঁজবো ? তার আবিষ্কার হবে না ভূগোলে। সে আছে, যায় নি। চিরদিনের মতন তার নাম স্মৃতির ফলকে আমি লিখেছি; বুঝেছি কতো দাম।
কবি আজীজুল হক এর বিখ্যাত প্রেমের কবিতা "দর্পণে বসন্ত শ্রাবণ"
দর্পণে বসন্ত শ্রাবণ
আজীজুল হক
দুঃখকে শনাক্ত করে দেখি অধিকাংশ দুঃখই সালেহাকে নিয়ে।
আঠাশটি বসন্ত সে দু'হাতে আড়ালে রেখে গাঢ়স্বরে বলে এক
শ্রাবণের কথা। বলে, আজতো অফিস ছুটি, চলো
কিছু ফল কিছু ফুল সঙ্গে নিয়ে যাওয়া যাক মেঘলা সকালে
হেনাদের বাড়ী; রবীন্দ্র-সঙ্গীতে ওর দেহ থেকে জ্বরের উত্তাপ
কিছু নেমে যায়, বিষণ্ণ ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে বেলকুঁড়ি
হাসি। বেলফুল তোমারিতো একদিন বেশি প্রিয় ছিল,
গোলাপে বিতৃষ্ণ তুমি, অশোকে পলাশে দারুণ অনীহা।
অথবা চলো না পার্কে, রোদের ভিতর থেকে ছায়া নেমে এলে
গভীর বিকেলে, দুপুরের রোদ মেখে শ্যামলী হেনারা
অপরাহ্নে কী রকম দুঃসাহসী হয়েছে দেখবে, অবিকল
প্রেমিকের হাত ধরে ছুটে যাচ্ছে তারা সন্ধ্যার ওপারে, হঠাৎ উঠছে জ্বলে লাল-নীল-বেগুনি আলোয় একসঙ্গে নগরের সবগুলো বাতি, দেখবে পাশের লেকে জল আমারি চোখের মতো টলটল করছে কেমন। আমি বিকেলে বললাম তাকে, নীল
আকাশে তাকালে তুমি শরতের সব শাদা মেঘে
খয়েরি বেগুনি লাল রঙ ধরে যাবে, নামালেই চোখ সেই মেঘে ঝরবে শ্রাবণ, সুশোভন কথা বটে, তবে সমস্যা ওখানে নয়। রোজ রোজ এইভাবে একা-একা আয়নায়
না-দাড়ানো ভালো । প্রাচীন দর্পণে দ্যাখো বেশ কিছু ফাটল
ধরেছে, এখানে ওখানে কিছু খসেছে পারদ। এ-পাশ ও-পাশ মুখ,
যতই ফেরাও, গ্রীবায় নিপুণ মুদ্রা তোলো, অক্ষম দর্পণ
ফিরিয়ে দেবে না আর সম্পূর্ণ তোমাকে। তুমি আমি
বরং এসোনা।
মুখোমুখি হই, মুখোমুখি রাখলেই দু'খানি দর্পণ
ভিতরের ক্ষণচিত্র অন্তহীন দৃশ্য হয়ে যায়।
একদিন তুমিও তো
ও-রকম দুঃসাহসী ছিলে, নগরের লাল-নীল
আর এক গাঢ় লাল গোলাপে বিশ্বাস
এক সঙ্গে জ্বলে উঠেছিল। অথচ কেন যে তুমি
শ্বেত মল্লিকার কথা তোলো। বটে
শ্রাবণে রবীন্দ্রনাথ কিছু বেশি সকরুণ হন, তখন বাগানে বেল-জুঁই ধারাস্থানে আরো কিছু শুভ্র হয়ে ওঠে, কিন্ত
কেন
তুমি সেই স্মৃতিগন্ধা মহিলার অবিকল মুখ
প্রাসঙ্গিক করে তুলে কাঁদো। আড়ালে বসন্ত কাঁদে, আমি
বসন্ত বসন্ত বলে,
গোলাপ গোলাপ বলে,
সালেহা সালেহা বলে
দর্পণের পেছনে দাড়াই।
কবি আলাউদ্দিন আল আজাদএর বিখ্যাত প্রেমের কবিতা "খুলে দাও"
খুলে দাও
আলাউদ্দিন আল আজাদ
চেঁচিয়ে বলছি দাও, খুলে দাও সকল দরোজা
তোমার বাগানে যাবো বহু আশা হাজার বছর
বুক ভরে নিয়ে পেরিয়ে এসেছি পাহাড় সাগর
নদ নদী তেপান্তর তিতির কান্নার মাঠ, সোজা
পিছে ফেলে ধুকধুক হৃৎপিন্ড হাতের ফিরোজা
অঙ্গুরীয় শুধু কিছু জ্বলে, দাও খুলে সব ঘর
সযন্তে গোপন দক্ষিণ সরণী প্রান্তে সরোবর
রত্নাগারে নিয়ে যাও, আর কত মণিমুক্তা খোজে
সামনে দাড়ালে যেন বৃষ্টিস্নাত ফুলের মঞ্জরী
হে বন্ধু বিদায় দাও' ঠোঁট নেড়ে বললে নিরালা, তোমারে কি দিতে পারি প্রতারক বসন্ত যখন ?” ওকথা বলোনা', বললাম 'কাছে এসো হে সুন্দরী, ভরপুর চোখে শুধু গলায় পরিয়ে দাও মালা
একফোঁটা অমৃতেই পেয়ে যাবো অনন্ত যৌবন।'
কবি আহসান হাবীব এর বিখ্যাত প্রেমের কবিতা "এইভাবে ছত্রিশ বছর"
এইভাবে ছত্রিশ বছর
আহসান হাবীব
এই ভালো এইভাবে ছত্রিশ বছর
এইভাবে ঠিকানাবিহীন,
এইভাবে পরস্পর সুদূর অজ্ঞাতবাস
এই ভালো।
এভাবেই পাওয়া যায় কাঙ্ক্ষিত যাপন, আর
অমরত্ব পাওয়া যায় মৃত্যুকে এড়িয়ে থাকা যায়,
এইভাবে সুদূর অজ্ঞাতবাসে প্রচন্ড খরায় খুব
ক্লান্ত হতে হতে
ক্লান্ত হতে হতে,
অনায়াস তোমার বেণীতে ক্লাস্ত হাত রেখে
বলতে পারি কি সুন্দর! তুমিও তখন
বলতে পারো খুলে দিলে আরো বেশী।
ভালো লাগবে, ছুঁয়ে দেখো, দেখনা অথবা
ক্লাশরুান্ত তোমার চিবুক থেকে,
একটি ছোট রূপ লি ঘামের কুচি তুলে নিলে
তর্জনী উঁচিয়ে তুমি বলতে পারে
হে বালক দুষ্টুমী করো না,
কোনো কোনো রাতে খুব ঘন বৃষ্টি হলে জানালায়
একাকী দাঁড়িয়ে।
বাইরে চোখ মেলে দেখতে পাই।
কলেজ চত্বর ছেড়ে বেরোচ্ছো অস্থির পায়ে দৃষ্টি এলোমেলো।
বলি, এতক্ষণে!ক টা ক্লাশ ?
কতকাল দাঁড়িয়ে রয়েছি,
তুমি শাড়ির আঁচলে মুখ মুছে নিয়ে বলতে পারো :
এই ভালো, আরো বেশী ক্লান্ত হও
ভালো লাগে অপেক্ষায় রাখা।
তারপর ফুটপাথ জনারণ্য ট্রামবাস
ট্যাক্সির গর্জন সব মুছে দিয়ে,
কি নির্জন কি নির্জন।
নিরুদ্দেশ এবং উধাও হতে হতে দেখে যেতে পারি বুকের ওপর ন্যস্ত বইখাতা বেণীর মোহন যাদু, আঠারোর অঙ্গস্ত্রী এবং তোমার চোখের পাতা জুড়ে
বসন্ত বাগান বাসা সরোবর চিত্রিত হরিণ।
এই ভালো, এইভাবে ছত্রিশ বছর
বাসা পেলে এতদিনে বয়স বেড়ে যেতো,
মেঘের বরণ চুল বেশ কিছু শাদা হতো
দুজনই অসুস্থ হতে হতে মৃত্যুর কথাও খুব মনে পড়ে যেতো।
এই ভালো এও ভালো
এইভাবে অজ্ঞাতবাসের খেলা
এভাবেই নীল আলোটি জ্বালিয়ে তুমি রয়ে গেছো আঠারো উনিশে স্থির, আমি চব্বিশে পঁচিশে,
এই ভালো।
কবি সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্ এর বিখ্যাত প্রেমের কবিতা "তুমি বড়ো জাগ্রত"
তুমি বড়ো জাগ্রত
সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্
এই আমি, আমি ছাড়া কে জানে তোমাকে আর
অতো ভালো ক'রে
আমি ছাড়া
কে জানে একটি দীর্ঘ
সজীব লতার কথা প্রহরে প্রহরে তাও
এতোদিন ধরে।
লতাটির দেহলগ্ন সবখানে ফুল হতো রোজ
পাতার আড়ালে সে কি অজস্রতা
কে আর দেখেছে বলো আমি ছাড়া অতো বেশী ফুল আর
লতাটির কোমল নম্রতা।
কেউ এসে প্রতিদিন নিজহাতে তুলে নিতো সব ফুল শীতগ্রীষ্ম সব ঋতুতেই
তখনো দেখেছি লতাটিকে পুষ্পহীন, দীনহীন ভিখিরীর মতো
যখন কোথাও নেই, তার গায়ে কোনো ফুল নেই
অমন বিরাট ক্লান্তি
বিষাদের সব শর্ত মেনে নিয়ে যায়
টিকে থাকা এতোদিন তার সব আর্তনাদ, সব অহংকার শুনেছি জেনেছি আমি, মনে আছে অবাক বিস্ময়ে কখনো দেখিনি তার কোনো ভয় জয় পরাজয়ে
আমরা দু'জনে মিলে অত্যাশ্চর্য জীবনের সেই দীর্ঘ লতার মহিম
স্বর্গমর্ত্য কোনখানে কে আর টানবে তার
কৃতিত্বের সুনিশ্চিত সীমা
অকৃতিয়ো কম নয় সুকৃতির পাশে
এ নিয়ে এঁকেছি কেউ, নাকি আমরাই
কিছু ছবি বানিয়েছি লঘু পরিহাসে
তবু কথা থাকে, কথা আছে, এই ধরো আমি দুই হাতে ছিড়েছি, তুলেছি ফুল প্রতিদিন, প্রতিটি প্রভাতে
দস্যুতা করিনি কিছু কম
ছিড়েছি সতেজ পাতা খামোকাই কতোদিন এবং চরম দেখিয়েছি নিষ্ঠুরতা দাঁতে নখে কখনো কখনো
তুমি ছিলে উদাসীন বাড়তি এ উপদ্রবে কিংবা কৌতূহলী
মনে আছে তখনো, তখনো।
তোমারো একটি কাজ ছিলো বটে ফুল ফোটানোর
মনে ছিলো অতোখানি জোর
রাতদিন ফুটিয়েছো ফুল,
শুধু ফুল মেলে না সংখ্যায় তার কোনো পরিমাপ
গণনাও হয় না নির্ভুল
তুমি ছিলে তাই এই জীবনের দীর্ঘ চারুলতা
আনন্দে বিষাদে আছে লতিয়ে পেঁচিয়ে ঠিক
কোনোখানে সেই একাগ্রতা
এপারে তোমার সেই বিখ্যাত পাহারা চোখে পড়ে
ওপারে আমার ঘাঁটি সত্য বটে বেশ নড়বড়ে
সতেজ সবুজদীর্ঘ লতাটিকে রেখেছো টিকিয়ে
মাঝখানে এতোদিন জানিনে কি দিয়ে
জানি খুঁটিনাটি, কতোকিছু ছোট বড়ো তোমার অজস্র কথা
এটুকু জানিনে ব'লে তুমি কিন্তু চিরজয়ী, চিরস্থায়ী কাছাকাছি আমার ভিন্নতা
ভীষণ ভঙ্গুর আর তাই বুঝি কম্পমান ভয়ে, ত্রাসে, সংশয়ে ব্যাকুল
ছিন্নভিন্ন হচ্ছি রোজ প্রতিটি সকালে
হাত ভরতি, সাজি ভরতি যখনি দেখেছি ফুল
যতোটা তোমাকে জানি, জানি আমি শতগুণ বেশী তারও চেয়ে তুমি ছাড়া লতাটিকে কে দিয়েছে এতোখানিসুরভি ছড়ায় ফুলগুলো দ্বিধাহীন গান গেয়ে গেয়ে
তোমার নামেই দেখি নামগান চতুর্দিকে অফুরন্ত সারাক্ষণ
অটুট যৌবন আর এতো দীর্ঘ সম্পন্ন জীবন
আমাকে দাঁড়াতে হয় সত্যি করজোড়ে
এ পথে সে পথে প্রতিদিন ছোটবড়ো মোড়ে
আমি আর কিছুই করিনি
ফুল তুলবার, পাতা ছিঁড়বার কাজ ছাড়া
আমি ছাড়া, এই আমি ছাড়া, কে বলো অতোটা জানে তুমি বড়ো জাগ্রত সেই তপস্বিনী।
প্রেমের কবিতা
আরো পড়তে click করুন
✅অপরিচিতা গল্পের গুরুত্বপূর্ণ mcq (pdf)সহ
✅বিড়াল গল্পের সৃজনশীল প্রশ্ন উত্তর (pdf)সহ
